মানবসভ্যতার বিবর্তনকে বোঝার জন্য শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতির দিকে তাকালে পুরো চিত্র দেখা যায় না। ইতিহাসের ভেতরে মানুষের মানসিকতা, আকাঙ্ক্ষা, সুখ, যন্ত্রণা, ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জটিল তন্তু জড়িয়ে আছে সাহিত্যের বুননে। সমাজে ভোগবাদ ও পুঁজিবাদ—এই দুটি ধারণা কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়; এগুলো সংস্কৃতি, চিন্তা, সম্পর্ক, ভালোবাসা এমনকি ভাষারও কাঠামো তৈরি করে। এই ব্যবস্থার বিকাশ ও বিস্তারে সাহিত্য একদিকে সহযোগী, অন্যদিকে প্রতিরোধের মাধ্যম। এক অর্থে সাহিত্যই পুঁজিবাদী বাস্তবতার আয়না—কখনও উজ্জ্বল, কখনও বিদীর্ণ।
সাহিত্য ও ভোগের মানসিক কাঠামো:
পুঁজিবাদী সমাজে ভোগ কেবল অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি মানসিক অবস্থা, এমনকি এক ধরনের অস্তিত্বগত ভাষা। মানুষ কী চায়—এটি স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেয় না; বরং সমাজ, সংস্কৃতি, বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র এবং সাহিত্য মিলেই তা নির্মাণ করে। এই নির্মাণপ্রক্রিয়ায় সাহিত্য একটি নীরব কিন্তু গভীর ভূমিকা পালন করে।
কার্ল মার্ক্স বলেছেন, “মানুষের চেতনা তার অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না; বরং তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে।” (Preface to A Contribution to the Critique of Political Economy, 1859)। মার্ক্সের এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যে সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি (base) যেমন, তার উপরেই গঠিত হয় সেই সমাজের সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য ও আদর্শের কাঠামো (superstructure)। তাই সাহিত্য কখনোই নিছক সৌন্দর্যবোধের অভিব্যক্তি নয়; এটি সামাজিক সম্পর্কের উৎপাদক। পুঁজিবাদী সমাজে যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদন ও ভোগক্ষমতা দিয়ে, সেখানে সাহিত্যও এক অর্থে হয়ে ওঠে পণ্য—বিক্রিত চেতনার বাহন। কিন্তু এই একই সাহিত্য আবার পারে সেই কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে, মানুষের ভেতরের মুক্ত চেতনা জাগিয়ে তুলতে।
সাহিত্য যখন কোনো জীবনকে “আকর্ষণীয়” বা “সফল” বা “গৌরবময়” হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন তা শুধু গল্প বলে না—একটি আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র তৈরি করে। পাঠক সেই মানচিত্র অনুসরণ করতে শুরু করে। এইভাবেই ভোগের মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়। মার্ক্স যে “commodity fetishism” -এর কথা বলেছেন, তা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এই অর্থে যে, পণ্য মানুষকে বাস্তব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক ধরনের মায়াবী সম্পর্ক তৈরি করে। (Capital, Vol.1)
ভোগবাদ সমাজে মানুষের চাহিদা কখনো শেষ হয় না; বরং ক্রমাগত নতুন আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। “তুমি যত বেশি ভোগ করবে, তুমি তত বেশি অস্তিত্ববান” -এই অদৃশ্য মন্ত্রই আধুনিক সমাজের মানদণ্ড। সাহিত্য এই মানসিকতার জন্ম, বিস্তার ও প্রতিক্রিয়া সবকিছুকেই ধারণ করে। ফিত্জেরাল্ডের The Great Gatsby (১৯২৫) এই ভোগবাদী স্বপ্নের এক প্রতীকী চিত্র। গ্যাটসবির জীবন যেন এক অবিরাম উৎসব—বিলাসিতা, পার্টি, ধন, প্রেম, সাফল্য। কিন্তু এই ভোগের আড়ালে থাকে শূন্যতা, এক গভীর অস্তিত্ব সংকট। ফিত্জেরাল্ড সেই শূন্যতাকেই ভাষা দিয়েছেন, দেখিয়েছেন ভোগের সোনালি মুখোশের পেছনে কতটা নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে থাকে। এক অর্থে, গ্যাটসবির মৃত্যুই ভোগবাদী স্বপ্নের মৃত্যু।
সাহিত্য ও পুঁজিবাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য:
পুঁজিবাদ কেবল শ্রম বা অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে না; এটি চেতনার উপরও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। আন্তোনিও গ্রামশি যাকে বলেছেন “cultural hegemony”—অর্থাৎ শাসন তখনই পূর্ণ হয়, যখন শাসিত নিজেই শাসনের যুক্তিকে স্বাভাবিক মনে করে।
সাহিত্য এই স্বাভাবিকীকরণের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। যখন উপন্যাস, গল্প বা জনপ্রিয় সাহিত্য বারবার ব্যক্তিগত সাফল্য, প্রতিযোগিতা, আত্মউন্নয়ন এবং বাজার-সাফল্যকে কেন্দ্র করে কাহিনি নির্মাণ করে, তখন পুঁজিবাদ নিজেকে “প্রাকৃতিক ব্যবস্থা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
এই ভোগবাদী সংস্কৃতির জন্মে সাহিত্যের ভূমিকা যেমন আছে, তার সমালোচনাতেও সাহিত্য নিজেকে ব্যবহার করে। যেমন, থিওডর ড্রাইজারের Sister Carrie (১৯০০) বা An American Tragedy (১৯২৫) পুঁজিবাদী সমাজে শ্রেণি ও স্বপ্নের সংঘর্ষ তুলে ধরেছে। ড্রাইজারের চরিত্ররা সাফল্যের জন্য লড়ে, কিন্তু তারা জানে না এই সাফল্যের মূল্য কত বড়। Sister Carrie-এর তরুণী নায়িকা ক্যারি যখন শহরে আসে, তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ভোগের জগতে প্রবেশ করা—নতুন পোশাক, নতুন জীবন, নতুন সত্তা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে, তার সুখ কেবল কৃত্রিম আলো। সাহিত্য এখানে একসাথে উন্মোচন ও সমালোচনার ভূমিকা পালন করে—যে সমাজ ভোগকে ঈশ্বর বানায়, তার দেবমূর্তিই সাহিত্য ভেঙে ফেলে। এখানে সাহিত্য সরাসরি প্রচারপত্র নয়; বরং এক ধরনের সূক্ষ্ম পুনরুৎপাদন ব্যবস্থা—যেখানে পাঠক বুঝতেই পারে না যে সে একটি অর্থনৈতিক আদর্শ গ্রহণ করছে, সে ভাবছে সে একটি গল্প উপভোগ করছে। এই প্রক্রিয়ায় সাহিত্য নিজেই “ideological apparatus” -এ পরিণত হয় (আলথুসারের ভাষায়), যেখানে রাষ্ট্র ও বাজার একসঙ্গে চেতনাকে গঠন করে।
প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে সাহিত্য:
যদিও সাহিত্য পুঁজিবাদের অংশ হতে পারে, তবুও তার গভীরতম শক্তি হলো প্রতিরোধ। সাহিত্য এমন একটি স্থান, যেখানে ভাষা নিজের কাঠামোকেই প্রশ্ন করতে পারে। সাহিত্য ভোগবাদ ও পুঁজিবাদের কাঠামোকে শক্তিশালীও করে, আবার চ্যালেঞ্জও জানায়।
প্রথমত, সাহিত্য মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দেয়। পুঁজিবাদী সমাজে ভোগ কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মানসিক ও নান্দনিক অভিজ্ঞতা। বিজ্ঞাপন, গল্প, উপন্যাস—সব মিলেই তৈরি করে “সুখের কল্পনা”। মার্ক্স যেমন বলেছিলেন, “Commodity has a metaphysical subtlety and theological nicety.” (Capital, Vol. 1)—অর্থাৎ পণ্য কেবল বস্তু নয়, এক ধরনের মায়া। সাহিত্যের চরিত্র, দৃশ্য, ও কাহিনি সেই মায়াকে স্থায়ী করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, সাহিত্য অনেক সময় পুঁজিবাদকে স্বাভাবিক করে তোলে। যখন কোনো উপন্যাসে ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি চরিত্রকে সফল, বুদ্ধিমান ও সম্মানীয় হিসেবে দেখানো হয়—তখন পাঠকের মধ্যে এক ধরনের অবচেতন শ্রদ্ধা জন্মায় পুঁজির প্রতি। ড্রামাটিক ট্র্যাজেডি বা প্রেমকাহিনিও অনেক সময় এই বাজারমূল্যকে বৈধ করে তোলে। জনপ্রিয় সাহিত্যের (popular literature) বড় অংশ বাজারের জন্য লেখা হয়, যেখানে পাঠকের চাহিদাই প্রাথমিক বিবেচনা। ফলে সাহিত্য প্রায়ই হয়ে ওঠে এমন একটি শিল্প, যা “বিক্রি হওয়ার জন্যই সৃষ্টি।” পুঁজিবাদ এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে তার সাংস্কৃতিক আধিপত্য (cultural hegemony) বজায় রাখে।
তৃতীয়ত, সাহিত্যের মধ্য দিয়ে আবার প্রতিরোধের ভাষাও জন্ম নেয়। জর্জ অরওয়েলের 1984 (১৯৪৯) কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়; এটি মানুষের মনোজগতের ওপর অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ভাষা। “Big Brother is watching you”—এই বাক্যটি আজও পুঁজিবাদী বা সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরদারির প্রতীক ও প্রকৃষ্ট উদাহরণ। Animal Farm (১৯৪৫) উপন্যাসেও অরওয়েল দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও অর্থ কিভাবে আদর্শকে গ্রাস করে। সাহিত্যে এই প্রতিরোধই সবচেয়ে মূল্যবান; কারণ এটি ভোগবাদী সমাজের মানসিক বন্দিত্বে এক ঝলক মুক্তির আলো আনে।
বাজারনির্ভর সাহিত্য ও প্রযুক্তির শাসন:
চতুর্থত, পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের যুগে সাহিত্যের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘বাজারনির্ভরতা’। সাহিত্য এখন শুধু ভাবনা নয়, একটি ‘প্রোডাক্ট’। প্রকাশনা, প্রচার, রেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া—সব মিলিয়ে সাহিত্যের বাণিজ্যিকতা লেখার স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করে। থিওডর অ্যাডোর্নো ও ম্যাক্স হরকহাইমার বলেছিলেন, “The culture industry perpetually cheats its consumers.” (Dialectic of Enlightenment, 1944)। তাদের মতে, আধুনিক সংস্কৃতি-শিল্প (cinema, novel, song, media) এমনভাবে গঠিত যে মানুষ ভোগ করতে করতে ভুলে যায় সে শাসিত হচ্ছে। সাহিত্য তাই যখন বাজারে ঢুকে পড়ে, তখন তা হয়ে ওঠে নরম-শাসনের (soft domination) মাধ্যম।
বর্তমান যুগে সাহিত্য নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে—যেখানে পাঠক, লেখক ও পাঠ্যবস্তু তিনটিই ডিজিটাল অ্যালগরিদম দ্বারা প্রভাবিত। এখন কোন বই “জনপ্রিয়” হবে, কোন লেখা “ট্রেন্ডিং” হবে—এটি শুধু সাহিত্যিক মানের প্রশ্ন নয়; এটি ডেটা, ক্লিক, এবং ভিউয়ের প্রশ্ন। যার পেছনে লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক অভিসন্ধি। ডেভিড বেরির ভাষায়, এটি ” algorithmic capitalism” —যেখানে সংস্কৃতি সরাসরি গণনাযোগ্য (quantified) হয়ে যায়। এর ফলে সাহিত্য দুইটি নতুন রূপ ধারণ করে:
প্রথমত, সাহিত্য হয়ে ওঠে “optimized content” -যেখানে শিরোনাম, ভাষা, এমনকি আবেগও পাঠক ধরে রাখার জন্য ডিজাইন করা হয়।
দ্বিতীয়ত, সাহিত্য হারাতে থাকে তার ধীরতা, গভীরতা ও অনিশ্চয়তা—যা একসময় চিন্তার মূল ভিত্তি ছিল।
এখানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো—মানুষ আর পাঠ করে না শুধুমাত্র বোঝার জন্য; বরং স্ক্রল করে “consume” করার জন্য।
এই পরিস্থিতিতে সাহিত্য যদি প্রতিরোধ করতে চায়, তবে তাকে আবার ধীর হতে হবে, জটিল হতে হবে, এবং অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতে হবে।
সাহিত্যের ভাষার ভেতরে মুক্তির রাজনীতি:
সাহিত্য পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করে না; বরং সে ভাষার ভেতরেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সাহিত্য কেবল আত্মসমর্পণ করে না। এখানেই আসে চারটি কৌশল—(ক) অপরাবৃত্তি ও বিরলতা, (খ) আয়নাচিত্র ও আভাস, (গ) আন্তঃশিল্প সংমিশ্রণ, এবং (ঘ) স্থানীয় ও বৈশ্বিক ডায়ালগ।
(ক) অপরাবৃত্তি মানে সেই সাহিত্য, যা পাঠকের প্রত্যাশাকে ভেঙে দেয়। রুশ সাহিত্যতত্ত্বে ভিক্টর শ্ক্লভস্কি যে “defamiliarization” ধারণাটি দেন, তা এখানে গভীর তাৎপর্য বহন করে। তাঁর মতে, শিল্পের কাজ হলো জিনিসকে এমনভাবে দেখানো যাতে তা নতুন, অপরিচিত মনে হয়।
পুঁজিবাদী বাস্তবতা মানুষকে যান্ত্রিক করে তোলে; কিন্তু সাহিত্য সেই যান্ত্রিকতাকে ভেঙে দেয় এক অপরিচিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, ওল্ডোস হাক্সলির Brave New World (১৯৩২) পাঠককে এমন এক ভবিষ্যৎ সমাজে নিয়ে যায়, যেখানে সুখ কৃত্রিম, সম্পর্ক প্রোগ্রাম করা, এবং মানুষকে শাসন করা হয় আনন্দের মাধ্যমে। এই ‘বিরল’ কাহিনি পাঠককে নিজের সমাজে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। অ্যালডাস হাক্সলির Brave New World এই কৌশলের অনন্য উদাহরণ—এক এমন ভবিষ্যৎ সমাজের ছবি যেখানে মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ও ভোগের নিয়ন্ত্রণে বাঁচে। পাঠক সেই জগৎ দেখে আতঙ্কিত হয়, অথচ একটু ভেবে বুঝে—এই ভবিষ্যৎ তো আসলে তার বর্তমানেরই প্রতিচ্ছবি।
একইভাবে মার্কেজের One Hundred Years of Solitude (১৯৬৭)-এ বাস্তব ও মিথের মিশেলে এমন এক জগৎ তৈরি করে, যেখানে ইতিহাস, স্মৃতি ও বাজারের টানাপোড়েন একাকার। পাঠক এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বুঝতে পারে, বাস্তবও ভোগবাদী কল্পনা হতে পারে। এখানে দেখা যায় এই অপরাবৃত্তির রূপ—ম্যাকন্দো নামের এক কাল্পনিক শহরের ইতিহাসে যেন মিশে আছে মানবসভ্যতার সমগ্র চিত্র। জাদুবাস্তবতার এই কৌশল পাঠককে নিজের বাস্তবতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
(খ) আয়নাচিত্র ও আভাস সাহিত্যের আরেকটি কৌশল। সরাসরি বক্তব্য না দিয়ে রূপকের মাধ্যমে সমাজের সংকট দেখানো যায়। টি. এস. এলিয়টের The Waste Land (১৯২২) আধুনিক মানুষের শূন্যতা, বিভাজন ও যান্ত্রিক জীবনের রূপক। “I will show you fear in a handful of dust” -এই লাইন যেন পুঁজিবাদী সভ্যতার কবিতা। টি. এস. এলিয়টের ‘The Waste Land’ এক বিরাট সভ্যতার অন্তঃসারশূন্যতা, আধ্যাত্মিক অবক্ষয় ও ভোগের অসারতা প্রকাশ করেছে এমনভাবে যে পাঠক নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
হেমিংওয়ের ‘The Sun Also Rises’ (১৯২৬)-এর চরিত্ররা ঘুরে বেড়ায়, পান করে, ভোগ করে, কিন্তু তাদের ভেতরে কেবল একটাই সত্য—অর্থহীনতা। এই আভাসগুলো পাঠককে নিজের ভোগজীবনের প্রতিফলন দেখতে বাধ্য করে। এ উপন্যাসে যুদ্ধোত্তর প্রজন্মের বিভ্রান্তি, ক্লান্তি ও অর্থহীনতার বোধ—ভোগের রাত্রির মধ্যেও যে আত্মার শূন্যতা বাড়তে থাকে, সেই ট্র্যাজেডিই সাহিত্যের মূল বার্তা। এখানে ভোগবাদের কোনো সরাসরি নিন্দা নেই, কিন্তু এক অন্তঃসারশূন্য আনন্দের অবসাদ পাঠককে নাড়া দেয়।
(গ) আধুনিক সাহিত্য প্রায়ই সংগীত, চিত্রকলা, সিনেমা বা স্থাপত্যের ভাষা গ্রহণ করে নিজেকে বহুমাত্রিক করে তোলে। এটি কেবল নান্দনিক পরীক্ষাই নয়, বরং পুঁজিবাদী একরৈখিক ভাবনার বিরুদ্ধে এক সৃজনশীল প্রতিরোধ। আন্তঃশিল্প সংমিশ্রণ সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এখন কবিতা কেবল বই নয়, গান, চিত্র, ভিডিও, পারফরম্যান্সের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ওরহান প্যামুক তাঁর Museum of Innocence (২০০৮)-এ উপন্যাসের পাশাপাশি একটি বাস্তব জাদুঘর গড়ে তুলেছেন, যেখানে গল্পের জিনিসগুলো বাস্তবে দেখা যায়। এটি ভোগবাদের জগতে এক অনন্য প্রতিক্রিয়া—বস্তু আর গল্পকে মিশিয়ে দিয়ে দেখানো যে স্মৃতিও পণ্যে রূপ নিতে পারে। উপন্যাসটি বাস্তবে একটি মিউজিয়ামে পরিণত হয়, যেখানে প্রেমিক তার হারানো ভালোবাসার স্মৃতি ধরে রাখে—জুতো, পারফিউম, চিরুনি। এই মিউজিয়ামই প্রতীক হয়ে ওঠে এমন এক পৃথিবীর, যেখানে মানুষ তার আবেগকেও সংগ্রহযোগ্য বস্তুতে রূপান্তরিত করে। কিন্তু প্যামুক সেই সংগ্রহের মধ্য দিয়েই প্রশ্ন তোলেন—”আমরা কি আমাদের ভালোবাসাকেও পণ্যে রূপ দিচ্ছি?”
এই কৌশলটি পাঠককে বাধ্য করে ভাবতে, আবেগের বাজারায়ন কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে।
(ঘ) স্থানীয় ও বৈশ্বিক ডায়ালগ হলো সাহিত্যের মুক্ত পথ। সাহিত্য যখন স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বৈশ্বিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে, তখনই তা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের শক্তি। সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হলেও এর অন্তর্নিহিত বোধ হলো মানুষের স্বাধীনতা, শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, যা বিশ্বজনীন।
একইভাবে চিনামান্ডা আদিচির ‘Half of a Yellow Sun’ নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের গল্প হলেও, এর ভিতর দিয়ে প্রতিফলিত হয় বিশ্বব্যাপী উপনিবেশোত্তর অর্থনৈতিক নিপীড়ন ও শ্রেণি-অসাম্য। স্থানীয় কণ্ঠস্বরের এই বৈশ্বিক প্রতিধ্বনি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ।
বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আজাদের
তার বিখ্যাত কবিতা “সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে”-এর একটি লাইন হলো:
“…চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত কিছু নষ্টদের অধিকারে”। কবিতাটিতে কবি সমাজের অবক্ষয়, ভণ্ডামি এবং নষ্টদের দাপট নিয়ে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন এবং তার দীপ্তি তখন সর্বজনীন বৈশ্বিক রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই ধরনের সাহিত্য স্থানীয় বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে, কিন্তু বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী চেতনার বিরোধিতা করে। এই চারটি কৌশলই সাহিত্যকে “বাজারের পণ্য” থেকে “চেতনার প্রতিরোধ” হিসেবে পুনর্নির্মাণ করে। এগুলোই প্রমাণ করে যে, যত গভীরই পুঁজিবাদ সমাজের শিরায় প্রবেশ করুক না কেন, সাহিত্যের রক্তে এখনও প্রতিরোধের নীল আগুন বয়ে চলে।
এই আলোচনার গভীরে গেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, একজন লেখক কতটা স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন, যখন বাজারই নির্ধারণ করে কোন লেখা জনপ্রিয় হবে? অনেক লেখক বুঝে না-বুঝে বাজারের “অ্যালগরিদমিক” কাঠামোয় ঢুকে যান—যেমন SEO, রেটিং, ট্রেন্ডিং বিষয়—ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে প্রোগ্রামযোগ্য পণ্য। দ্বিতীয়ত, পাঠকও এখন ভোগবাদী—সে সাহিত্যকে “বিনোদন” হিসেবে গ্রহণ করে, আত্মসমালোচনার মাধ্যম হিসেবে নয়। তৃতীয়ত, AI ও প্রযুক্তির যুগে সাহিত্য আরও এক ধরণের পুঁজিবাদে প্রবেশ করছে, যাকে বলা যায় “algorithmic capitalism” —যেখানে শিল্পকর্মের জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করে কোড, মেশিন, ও ডেটা।
এই পরিস্থিতিতেও সাহিত্যই একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ এখনো নিজের মানবতা খুঁজে পেতে পারে। কারণ সাহিত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ কেবল ভোগকারী নয়; সে চিন্তাশীল, অনুভূতিশীল, প্রতিবাদী প্রাণী। যখন কবি টি. এস. এলিয়ট বলেন, “Where is the wisdom we have lost in knowledge? Where is the knowledge we have lost in information?” -তিনি আসলে প্রশ্ন করেন আমাদের যুগের অর্থনীতিকে, প্রযুক্তিকে, ও চেতনাকে।
অতএব, সাহিত্য পুঁজিবাদ ও ভোগবাদে এক জটিল দ্বৈত ভূমিকা পালন করে—এটি একই সঙ্গে তাদের সন্তান ও তাদের সমালোচক। একদিকে এটি ভোগবাদী সমাজের মানসিক কাঠামোকে ভাষা দেয়, অন্যদিকে সেই কাঠামোর ভেতরেই জন্ম দেয় মানবতার প্রশ্ন। কার্ল মার্ক্স যেমন বলেছিলেন, “The artist produces not only an object but also creates a world for man.” এই বিশ্বটাই সাহিত্যের প্রকৃত ভূমিকা—যেখানে মানুষ শুধু ভোগ নয়, বোঝে, অনুভব করে, এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তি খোঁজে।
সুতরাং বলা যায়, সাহিত্যই সেই স্থান, যেখানে পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের সংঘর্ষ মানব আত্মায় রূপান্তরিত হয়। সাহিত্য যতদিন থাকবে, মানুষ ততদিন ভাববে—আমি কী ভোগ করছি, আর কী হারাচ্ছি।
(লেখক একজন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও পরিবেশবাদী সংগঠক)